বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​প্রকৃতির প্রতিশোধ

​প্রকৃতির প্রতিশোধ

বিজ্ঞাপন
পাবনার দশ বছর বয়সী এক শিশুকন্যাকে নির্যাতনের কাহিনিতে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশ। এতে ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার নমুনা দেখছেন দেশের মানুষ। এটা অবশ্য দেশের মানুষের কাছে ডাল-ভাতের মতো সহজ একটা বিষয়ে পরিণত হয়ে দাঁড়ালেও পাবনাবাসীর কাছে নির্মম এক হত্যাকাণ্ড বলেই বিবেচিত হয়ে ওঠায় একটু বেশিই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলেন তারা। সংশ্লিষ্ট থানার উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলতে শোনা গেল, ‘কলি’ নামের দশ বছর বয়সী ওই মেয়েটি তার বয়সের তুলনায় যথেষ্টই বড়সড় ছিল এবং একটু বেশিই সুন্দরী ছিল। তিনি অবশ্য সেই সব কারণকে খুন হওয়ার পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিল কি না সেটা নিয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি, যদিও খুনের মোটিভ উদ্্ঘাটনে গিয়ে আলামত হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তির ঘরের একটি রুমের মেঝেতে স্যাভলনের প্রচণ্ড গন্ধ তার ভেতরে একটা বড়সড় ধাক্কা দিয়েছিল বলেই খুনির পরিচয় চিহ্নিত করতে আর বেগ পেতে হয়নি বলে জানিয়েছিলেন তিনি। অথচ চিহ্নিত ঘাতক শিশু কলিকে ধর্ষণের পরে তার খণ্ডিত লাশ লুকিয়ে রেখেছিল নিজের ঘরের ভেতরের একটি রুমে।

তার পরের ঘটনা আরও রোমহর্ষক। কারণ নাই হয়ে যাওয়া শিশুটির সন্ধানে যখন স্থানীয় জনগণ মানববন্ধনসহ অন্যান্য প্রতিবাদের মহড়া অব্যাহত রেখেছিল, সেই সব প্রতিবাদী মানুষের কাতারে ধর্ষক মোস্তফারও সরব উপস্থিতি দেখা গেল। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা আছে। মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয় যখন ফেল মারে, প্রকৃতি তখন এগিয়ে আসে। মোস্তফা নামক মানুষটির বাইরের নির্লিপ্ত লেবাসও তাকে সেই প্রতিশোধের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারল না। তার নিজের দোতলা বাড়ির যে ঘরটির একটা খাটের নিচে কলি নামক মাসুম শিশুকন্যাটির নিথর দেহ লুকিয়ে রেখেছিল কয়েকটা ঘণ্টা, সেই ঘরেই তৈরি হয়েছিল বিদ্ঘুটে একটা শরীর-পচা গন্ধ। যে গন্ধ তাকে প্রচণ্ড ধরনের ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো কাহিনির জন্ম দিল। ফলে তার অপর সহযোগীর সহায়তায় রাতের অন্ধকারে লাশটা লুকিয়ে একটা ছড়ায় ফেলে দিয়ে এসে রাতভর দুজন মিলে সেই রুম থেকে লাশ-পচা গন্ধ দূর করার অভিপ্রায়ে এতটাই স্যাভলনের শিশি উপড় করে ঢেলে দিয়েছিল মেঝেতে যে তার পরের কদিন সেই ঝাঁঝালো গন্ধ থেকে মুক্তি মিলল না রুমের ভেতরের মাটি থেকে কড়িকাঠ। আর তদন্ত করতে এসে গোলক-ধাঁধায় পড়ে গেল থানার তদন্ত টিম। আর তার পরেই স্বীকার করতে বাধ্য হলো দুই কুলাঙ্গার খুনি।

আসলে প্রকৃতি এভাবেই প্রতিশোধ নেয়। আমরা শুধু বেকুবের মতো দেখেও না দেখার ভান করি। শেষ পর্যন্ত দুই খুনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তাতে খুব একটা খুশি হতে পারছেন না। আর পারছেন বলেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে গিয়ে তারা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন যে থানার জনৈক কর্মকর্তাকে বলতে হলো, সাধারণ মানুষের ওই প্রতিবাদী ভূমিকার কাছে সেই মুহূর্তে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের অসহায়ত্ব এতটাই প্রকট ছিল যে তারা দূর থেকে শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার সাহস দেখাতে পারেননি। সাধারণ মানুষ এতটাই মারমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ধর্ষক ও খুনি মোস্তফার দ্বিতল বাড়িটি হাতুড়ির আঘাতে আঘাতে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন। অনেকের মতে, বাড়ির কী দোষ ছিল, এভাবে একটি স্থাপনাকে ভেঙে ফেলার ভেতর দিয়ে কার্যত পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে পথে বসিয়ে দিলেন তারা। বিষয়টা সেইভাবেও বিবেচনায় রাখা যায়, আবার নাও যেতে পারে—একটি পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যখন একটা খুনির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন, তখন তার দায়ভার কিছুটা হলেও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ওপরও বর্তায়। কাজেই দায়মুক্তির কোনো উপায় নেই সেই কুলাঙ্গারের অর্থে লালিত-পালিত পরিবারের অন্য সদস্যদেরও। কিন্তু এর পরে সরকার কী করবে, বলবে কী? আইন তার নিজস্ব নিয়মে পথ চলে বা চলবে?

রামিশা নামের আট বছরের আরেকটি শিশুকন্যাকে যখন ২০২৫ সালের ১৯ মে ঢাকার মিরপুরে সোহেল রানা নামের আরেক খুনি-ধর্ষক গলা কেটে বাথরুমের বালতিতে কর্তিত মাথাটি রেখে ধামাচাপা দিতে গিয়ে ধরা পড়েছিল সস্ত্রীক, রাজধানীর সাধারণ মানুষ একইভাবে সোহেল রানাকে থানা থেকে ছিনিয়ে আনতে গেলে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন কথাটা—এটা কোনো মধ্যযুগীয় সময় নয় যে প্রকাশ্যে খুনিকে তার শাস্তি দিতে হবে। এই দেশে আইন তার নিয়মমতোই চলবে, জনগণ কী বলল, সেটা দেখা সরকারের কাজ নয়।
সরকারকে এত সকাল সকাল ভুলে গেলে চলবে কীভাবে? সতেরো বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারকে দেশছাড়া, গদিছাড়া করতে এই জনগণের ভেতরের নিরীহ ১৪শ মানুষ প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিল বলেই বিএনপি আজ সরকার গঠন করতে পেরেছে। বলতে দ্বিধা নেই, এই বিএনপি সরকারের মাত্র সাত মাসের মাথায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এতটা অবনতি হয়েছে যে, দেশের আপামর জনগণ এখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস দেখাতে পারছেন। এই পারার পেছনে সরকারের ব্যর্থতা ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আইন সব সময় নিজের মতো পথ চলে না, কিছু কিছু আইনভঙ্গের কাহিনি দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পেছনে বড় একটা ভূমিকা পালন করে থাকে। এই বিষয়টিকে মাথায় নিয়ে সরকারকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে প্রকৃতি কিন্তু প্রতিশোধ ঠিকই নেবে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz